নতুন দেশে পৌঁছে প্রথম সপ্তাহে কী কী করবেন
পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট
বিমান থেকে নামার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা সবার কাছেই একটু ঘোরের মতো কাটে। নতুন শহর, নতুন ভাষা, অচেনা মুখ। কিন্তু এই প্রথম সপ্তাহের কিছু সিদ্ধান্ত পরের পুরো মেয়াদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি ঠিক করে দেয়। যাঁরা প্রথম সপ্তাহে কাগজ গুছিয়ে নেন, ঠিকানা জানিয়ে রাখেন আর কাজের নিয়ম বুঝে নেন, তাঁদের পরে ঝামেলা অনেক কম হয়।
এই লেখায় প্রথম দিন থেকে সপ্তম দিন পর্যন্ত একটি সাধারণ তালিকা দেওয়া হলো। আপনার দেশ, কাজ ও নিয়োগকর্তার নিয়ম অনুযায়ী তালিকা কিছুটা বদলে যাবে। তাই এটাকে কাঠামো হিসেবে নিন, আর নিজের পরিস্থিতিতে মিলিয়ে নিন।
সতর্কতা: কোনো একটি দেশের নিয়ম সব দেশে একই নয়। থাকা, ফোন সংযোগ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা নিবন্ধনের কোন ধাপ কাকে করতে হয়, তা নিয়োগকর্তা, দূতাবাস বা অফিসিয়াল সূত্র থেকে মিলিয়ে নিন। এই লেখা আইনি পরামর্শ নয়।
প্রথম দিন: পৌঁছে নিজেকে নিরাপদ করুন
- পরিবারকে জানান: পৌঁছেই ছোট একটা বার্তা বা ফোন করুন। কোথায় আছেন, কে নিতে এলো, তার নাম ও নম্বর জানিয়ে রাখুন।
- নিয়োগকর্তার প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করুন: যিনি আপনাকে নিতে এসেছেন, তিনি আগে থেকে ঠিক করা মানুষ কি না, নাম ও ফোন নম্বর মিলিয়ে নিন। অচেনা কারও সঙ্গে যাবেন না। বিমানবন্দরের ধাপগুলো নিয়ে দেখুন প্রথমবার বিদেশে গেলে বিমানবন্দরে কী কী করবেন।
- থাকার জায়গার ঠিকানা লিখে নিন: রাস্তার নাম, ভবনের নাম, কাছের পরিচিত জায়গা। ফোন বন্ধ হলেও যেন কাউকে ঠিকানা দেখাতে পারেন।
- আসল কাগজ কার কাছে, জানুন: পাসপোর্ট ও ভিসা আপনার কাছে থাকছে, না নিয়োগকর্তার কাছে, তা পরিষ্কার জানুন। কেউ রেখে দিতে চাইলে কী করবেন, তা তৃতীয় দিনের অংশে ও কাগজ-সুরক্ষার লেখায় আছে।
দ্বিতীয় দিন: যোগাযোগের ব্যবস্থা
- ফোন ও ইন্টারনেট: স্থানীয় সংযোগ কীভাবে নেওয়া যায়, তা নিয়োগকর্তা বা বিশ্বস্ত সহকর্মীর কাছে জিজ্ঞেস করুন। সংযোগ নেওয়ার নিয়ম দেশভেদে আলাদা, কখনো পরিচয়পত্র বা ভিসার কাগজ লাগে।
- জরুরি নম্বর সংরক্ষণ করুন: স্থানীয় পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সের জরুরি নম্বর, নিয়োগকর্তার নম্বর এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের নম্বর। দূতাবাসের সেবা নিয়ে দেখুন প্রবাসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেবাগুলো কী কী।
- পরিবারের সঙ্গে সময় ঠিক করুন: কখন কথা হবে। সময়ের পার্থক্য মাথায় রাখুন। দেখুন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সহজ উপায়।
তৃতীয় দিন: কাগজের কপি ও নিরাপদ জায়গা
- পাসপোর্ট, ভিসা ও চুক্তির ছবি তুলে ফোনে ও ইমেইলে রাখুন, আর পরিবারের একজনকে পাঠিয়ে দিন।
- আসল কাগজ রাখার নিরাপদ জায়গা ঠিক করুন, আর কাউকে সঙ্গে সঙ্গে হাতে তুলে দেবেন না। বিস্তারিত নিয়ম পাবেন প্রবাসে নিজের কাগজপত্র নিরাপদে রাখার নিয়ম লেখায়।
- নিজের ঘরের তালা ও জিনিসপত্র রাখার ব্যবস্থা দেখে নিন।
চতুর্থ দিন: কাজ ও চুক্তি বুঝে নিন
- কাজের জায়গা, সময়সূচি ও কার কাছে রিপোর্ট করবেন, তা পরিষ্কার জানুন।
- দেশ ছাড়ার আগে যে চুক্তি সই করেছিলেন, তার একটি কপি সঙ্গে রাখুন। এখানে কাজের শর্ত আর চুক্তির শর্ত এক কি না মিলিয়ে দেখুন। না মিললে ভদ্রভাবে লিখিতভাবে জানতে চান। মেলানোর উপায় দেখুন ভিসা ও কাজের চুক্তি মিলিয়ে দেখবেন কীভাবে।
- নিরাপত্তা নিয়ম, যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও দুর্ঘটনা হলে কী করবেন, জেনে নিন। এসব না বুঝে কাজ শুরু করবেন না।
পঞ্চম দিন: স্বাস্থ্য ও খাওয়া-থাকা
- অসুস্থ হলে কোথায় যাবেন, চিকিৎসার খরচ কে দেবে, তা নিয়োগকর্তার কাছে জেনে নিন। দেখুন বিদেশে অসুস্থ হলে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে জানার কথা।
- নতুন আবহাওয়ায় শরীর মানিয়ে নিতে সময় লাগে। পানি, ঘুম ও খাবারে সতর্ক থাকুন।
- আপনার খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা চুক্তি অনুযায়ী মিলছে কি না দেখুন।
ষষ্ঠ দিন: টাকার ব্যবস্থা
- বেতন কীভাবে ও কবে পাবেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা লাগবে কি না, নিয়োগকর্তার কাছে জানুন।
- দেশে টাকা পাঠানোর জন্য বৈধ পথ বেছে নিন। হুন্ডির ঝুঁকি নিয়ে পড়ুন বৈধ পথে টাকা পাঠানো কেন নিরাপদ, আর হুন্ডির ঝুঁকি কী কী।
- প্রথম বেতনের আগে অল্প টাকা হাতে রাখুন, আর অচেনা কারও কাছে ধার চাইবেন না।
সপ্তম দিন: পরিচিত হওয়া ও পরিকল্পনা
- ভালো ও বিশ্বস্ত সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচিত হোন। বাংলাদেশি কমিউনিটি থাকলে সংযোগ রাখুন। বিস্তারিত পাবেন প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে কীভাবে সাহায্য পাবেন।
- স্থানীয় আইন ও আচরণের মূল বিষয়গুলো জেনে নিন, বিশেষ করে যা না জেনে ভুল করা সহজ। দেখুন ভুল করে স্থানীয় আইন ভাঙা এড়ানোর সাধারণ নিয়ম।
- নিজের পরিকল্পনা লিখুন: মাসে কত পাঠাবেন, কত জমাবেন।
প্রথম সপ্তাহের সাধারণ ভুল
- সবাইকে বিশ্বাস করা: নতুনদের সুযোগ নিতে অনেকেই আসে। "আমি সাহায্য করব, কাগজ আমার কাছে দিন" ধরনের প্রস্তাব এড়িয়ে চলুন।
- কাগজ হাতছাড়া করা: বিনা রসিদে কাউকে আসল কাগজ দেবেন না।
- পরিবারকে না জানানো: সমস্যা হলে পরিবারই প্রথম সাহায্যের পথ খুঁজতে পারে, যদি তারা আপনার ঠিকানা ও নিয়োগকর্তার নাম জানে।
- প্রথম সপ্তাহেই বড় সিদ্ধান্ত: চাকরি ছাড়া, জায়গা বদলানো বা টাকা ধার দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে নেবেন না।
- অসুস্থতা বা সমস্যা চেপে যাওয়া: ছোট সমস্যা সময়মতো বললে বড় হয় না।
বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইবেন, তা আগে থেকে জেনে রাখুন: বিদেশে বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইবেন।
অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)
প্রবাসী কর্মীদের জন্য সরকারি তথ্য ও দূতাবাসের তালিকা এখানে দেখুন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: প্রবাসী কর্মীদের জন্য সরকারি তথ্য, অভিযোগের ব্যবস্থা ও যোগাযোগের নম্বর।
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনের তালিকা এবং কনস্যুলার সেবার তথ্য।