বিদেশে বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইবেন: দূতাবাস, শ্রম দপ্তর ও আইনি সহায়তার পথ
আপডেট: পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট
বিদেশে একা থাকেন, ভাষা অচেনা, আইন আলাদা। এমন জায়গায় হঠাৎ বিপদ এলে মাথা ঠিক রাখা কঠিন। কিন্তু কার কাছে যেতে হবে, সেটা আগে থেকে জানা থাকলে অনেক বড় ক্ষতি এড়ানো যায়।
সতর্কতা: এই লেখায় কোনো ফোন নম্বর, আইনের ধারা বা সময়সীমা দেওয়া হয়নি, কারণ এগুলো দেশভেদে ভিন্ন এবং বদলায়। জরুরি যোগাযোগের নম্বর ও ঠিকানা সবসময় সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে নিন (যাচাই করুন)।
বিপদ আসার আগেই প্রস্তুতি
এই কাজগুলো আজই করে রাখতে পারেন:
- কাগজের ছবি: পাসপোর্ট, ভিসা, রেসিডেন্স কার্ড (ইকামা বা সমতুল্য), কাজের চুক্তি ও এজেন্সির কাগজের ছবি তুলে ফোনে, নিজের ইমেইলে এবং দেশে পরিবারের কাছে রাখুন।
- দূতাবাসের তথ্য: আপনার শহরের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের ঠিকানা, ইমেইল ও জরুরি যোগাযোগের নম্বর ফোনে সেভ করুন।
- স্থানীয় জরুরি নম্বর: পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর আপনার দেশে কী, জেনে নিন।
- বিশ্বস্ত মানুষ: একজন-দুজন বাংলাদেশি সহকর্মী বা বন্ধুর নম্বর রাখুন। বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠনের খোঁজ রাখুন।
- এজেন্সির তথ্য: যে এজেন্সির মাধ্যমে গেছেন, তার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংরক্ষণ করুন। অনেক ক্ষেত্রে দেশের এজেন্সিরও দায়বদ্ধতা থাকে।
- বীমা ও চিকিৎসা: আপনার চিকিৎসা বা বীমার সুবিধা চুক্তি অনুযায়ী কী, জেনে রাখুন।
কার কাছে সাহায্য চাইবেন
১. বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট
বিদেশে সবচেয়ে প্রথম ভরসা। অনেক দূতাবাসে শ্রম কল্যাণ বিভাগ বা শ্রম উইং থাকে (সব দেশে নয়, যাচাই করুন)। বেতন না পাওয়া, নির্যাতন, কাগজপত্র, আইনি বিপদ বা ফিরে আসার সহায়তার জন্য এখানে যোগাযোগ করুন। যোগাযোগ করার সময় আপনার নাম, পাসপোর্ট নম্বর, নিয়োগকর্তার নাম ও ঠিকানা, আর সমস্যাটা সংক্ষেপে লিখে নিন।
২. ওই দেশের শ্রম দপ্তর ও শ্রম আদালত
বেতন, কাজের পরিবেশ ও চাকরি থেকে অন্যায় বরখাস্তের মতো বিরোধে অনেক দেশে সরকারি শ্রম দপ্তরে অভিযোগ করার ব্যবস্থা আছে। কীভাবে ও কোথায় অভিযোগ করবেন, তা দূতাবাস বা ওই দেশের অফিসিয়াল সূত্রে জেনে নিন।
৩. স্থানীয় পুলিশ
মারধর, চুরি, ছিনতাই বা অন্য অপরাধের শিকার হলে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করুন। অভিযোগের কপি বা রসিদ চেয়ে নিন।
৪. বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট সংস্থা
দেশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, BMET ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসীদের নানা সহায়তার সঙ্গে যুক্ত। কোন ক্ষেত্রে কী সহায়তা পাওয়া যায় ও শর্ত কী, তা তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যাচাই করুন। পরিবারের কেউ দেশে এসব অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
৫. রিক্রুটিং এজেন্সি
যে এজেন্সির মাধ্যমে গেছেন, তাদের জানান। ভিসা, চুক্তি বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে সমস্যা হলে এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ব্যবস্থা থাকতে পারে (যাচাই করুন)।
৬. কমিউনিটি ও বেসরকারি সংগঠন
বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠন, ধর্মীয় বা সামাজিক সংগঠন অনেক সময় দ্রুত সাহায্য করে। তবে কাউকে টাকা দেওয়ার আগে সেই সংগঠনের পরিচয় যাচাই করুন।
সমস্যা অনুযায়ী করণীয়
বেতন না পেলে
- কত মাসের বেতন বাকি এবং কবে কী বলা হয়েছিল, লিখে রাখুন।
- চুক্তি, বেতনের স্লিপ বা ব্যাংকের হিসাব, মেসেজ ও কথোপকথন সংরক্ষণ করুন।
- নিয়োগকর্তাকে লিখিতভাবে (মেসেজ বা ইমেইলে) জানিয়ে রাখুন।
- সমাধান না হলে দূতাবাস ও ওই দেশের শ্রম দপ্তরে অভিযোগ করুন।
নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট রেখে দিলে
দেশভেদে নিয়ম আলাদা, কোথাও নিয়োগকর্তার পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখা আইনত নিষিদ্ধ হতে পারে (যাচাই করুন)। নিজে জোর করে নিতে যাবেন না, ঝামেলা বাড়তে পারে। দ্রুত দূতাবাসকে জানান।
অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা হলে
আগে চিকিৎসা। তারপর নিয়োগকর্তা ও বীমা কর্তৃপক্ষকে জানান। চিকিৎসার কাগজ, হাসপাতালের রসিদ ও ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। কর্মস্থলের দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের নিয়ম দেশভেদে আলাদা, তাই দূতাবাসের পরামর্শ নিন।
আইনি ঝামেলায় পড়লে বা গ্রেফতার হলে
- শান্ত থাকুন। পুলিশের সঙ্গে তর্ক করবেন না।
- নিজের দেশের দূতাবাসকে জানানোর অনুরোধ করুন। অনেক দেশে এটা আপনার অধিকার।
- যে ভাষা বোঝেন না, সেই ভাষার কাগজে সই করার আগে অনুবাদ চান।
- পরিবারকে দ্রুত জানান যাতে তারা দেশ থেকেও যোগাযোগ করতে পারে।
ভিসার মেয়াদ শেষ বা কাজ ছেড়ে চলে আসার ভয়
ভিসা বা রেসিডেন্সের মেয়াদ শেষ হলে বা নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চলে এলে অনেক দেশে জরিমানা বা অন্য শাস্তির ঝুঁকি থাকে। কখনো কখনো সরকার বিশেষ সুযোগ বা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। এগুলো সময়ে সময়ে বদলায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগে দূতাবাসে পরামর্শ নিন।
পরিবারের কারও বিদেশে মৃত্যু হলে
পরিবার দ্রুত ওই দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস ও দেশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মরদেহ ফেরত আনা, কাগজপত্র ও সহায়তার নিয়ম অফিসিয়াল সূত্র থেকে জেনে নিন (যাচাই করুন)।
সতর্কতা: বিপদের সময় "আমি আপনাকে উদ্ধার করে দেব, শুধু কিছু টাকা পাঠান" বলে অনেকে সুযোগ নেয়। সাহায্যের নামে অচেনা কাউকে আগাম টাকা পাঠাবেন না। সবসময় দূতাবাস বা অফিসিয়াল সংস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত হোন। ওটিপি ও ব্যাংকের তথ্য কাউকে দেবেন না।
বিপদের সময় একটি ছোট চেকলিস্ট
- নিজে নিরাপদ জায়গায় আছেন কিনা নিশ্চিত করুন।
- পরিবার বা বিশ্বস্ত কাউকে জানান।
- দূতাবাসে যোগাযোগ করুন।
- সব প্রমাণ (কাগজ, মেসেজ, ছবি) সংরক্ষণ করুন।
- কোনো কাগজে না বুঝে সই করবেন না।
- যা ঘটছে, তারিখসহ লিখে রাখুন।
বিদেশে যাওয়ার আগে কীভাবে প্রতারণা এড়াবেন, তা জানতে পড়ুন এজেন্সি ও ভিসা যাচাইয়ের গাইড।
অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)
এই লেখার তথ্য মিলিয়ে নিতে নিচের অফিসিয়াল সাইট দেখতে পারেন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: প্রবাসী কর্মী ও বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।