প্রবাসে মানসিক চাপ ও একাকিত্ব সামলানোর উপায়
পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৪ মিনিট
বিদেশে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় টাকা, ভিসা আর কাজের কষ্ট নিয়ে। কিন্তু অনেকে যেটা মুখ ফুটে বলেন না, সেটা হলো মনের কষ্ট। পরিবার থেকে অনেক দূরে, ছুটিহীন লম্বা সময়, ঋণের চিন্তা আর রাতে ঘুম না আসা: এসব একসঙ্গে চেপে বসলে মন খারাপ হওয়া খুব স্বাভাবিক।
এই লেখায় একজন চিকিৎসকের মতো উপদেশ দেওয়া হচ্ছে না। উদ্দেশ্য হলো আপনাকে জানানো যে আপনি একা নন, কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন আর নিজের যত্ন নেওয়ার কিছু সহজ উপায় কী।
সতর্কতা: এই লেখা মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা বা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। যদি আপনার নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসে, বা আপনি ভীষণ হতাশ বোধ করেন, অবিলম্বে একজন বিশ্বস্ত মানুষকে জানান এবং স্থানীয় জরুরি সেবা বা স্বাস্থ্যসেবার সাহায্য নিন। একা থাকবেন না।
কেন প্রবাসে মন খারাপ হয়
- পরিবার ও বন্ধু দূরে: বিয়ে, জন্ম, অসুস্থতা বা মৃত্যুর মতো বড় ঘটনায় পাশে থাকতে না পারার কষ্ট।
- লম্বা কাজ, কম বিশ্রাম: শরীর ক্লান্ত হলে মনও দুর্বল হয়।
- অচেনা পরিবেশ ও ভাষা: নিজের কথা বোঝাতে না পারা, মানুষের সঙ্গে মিশতে না পারা।
- টাকার চাপ: ঋণ, বেতন দেরিতে পাওয়া, পরিবারের চাহিদা।
- কাজের সমস্যা: ভিসা ও কাগজের দুশ্চিন্তা, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বনিবনা না হওয়া।
- প্রত্যাশা আর বাস্তবের ফারাক: যে স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন, বাস্তবে তা না মেলা।
কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন
মাঝে মাঝে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু নিচের লক্ষণগুলো যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে, তাহলে অবহেলা করবেন না:
- প্রায় প্রতিদিন মন খুব খারাপ বা শূন্য লাগা
- আগে যা ভালো লাগত, তাতে আর আগ্রহ না থাকা
- ঘুম খুব কমে যাওয়া বা অতিরিক্ত ঘুম
- খিদে কমে যাওয়া বা অতিরিক্ত খাওয়া
- সবার থেকে দূরে সরে থাকা, কথা বলতে ইচ্ছা না হওয়া
- কাজে মনোযোগ না থাকা, বারবার ভুল হওয়া
- নেশা বা অতিরিক্ত ধূমপানের দিকে ঝোঁক
- নিজেকে অপদার্থ মনে হওয়া বা নিজের ক্ষতির চিন্তা
এগুলোর যেকোনো একটি এত প্রবল হলে বা অনেকগুলো একসঙ্গে থাকলে একজন বিশ্বস্ত মানুষ বা স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর সঙ্গে কথা বলা উচিত।
প্রতিদিনের ছোট অভ্যাস যা কাজে লাগে
- নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন: পরিবারের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে কথা বলুন। কিন্তু কেবল সমস্যা আর টাকার কথায় সীমাবদ্ধ রাখবেন না, ছোটখাটো দিনের গল্পও করুন। পড়ুন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সহজ উপায়।
- একটা রুটিন বানান: ঘুম, খাওয়া ও বিশ্রামের নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। অনিয়মিত জীবন মন খারাপ বাড়ায়।
- শরীরকে নাড়ান: কাজের পর বা ছুটির দিনে হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম মেজাজ ভালো রাখে।
- একজন বিশ্বস্ত বন্ধু রাখুন: সহকর্মী বা কমিউনিটির কেউ, যাঁর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা যায়। কমিউনিটি থেকে সাহায্য পাওয়ার উপায় আছে প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে কীভাবে সাহায্য পাবেন লেখায়।
- নিজের ধর্মীয় বা পছন্দের অভ্যাস রাখুন: প্রার্থনা, গান, বই বা অন্য যা মনে শান্তি দেয়।
- ছোট লক্ষ্য ঠিক করুন: কত মাসে ঋণ শোধ হবে, কবে দেশে যাবেন। লক্ষ্য মনে আশা জোগায়। খরচ ও ঋণের হিসাব রাখতে দেখুন বিদেশ যাওয়ার খরচের হিসাব কীভাবে রাখবেন।
- নেশায় সান্ত্বনা খুঁজবেন না: অ্যালকোহল, মাদক বা অতিরিক্ত ধূমপান সাময়িক আরাম দিলেও সমস্যা বাড়ায়। অনেক দেশে এগুলো আইনেও বিপদে ফেলে।
কথা বললে কী হয়
অনেকে ভাবেন, মন খারাপের কথা বললে লোকে দুর্বল ভাববে। আসলে কথা বললে চাপ অনেক কমে। একজন ভরসার মানুষকে বলুন: "আমার কিছুদিন ধরে ভালো লাগছে না, একটু কথা বলতে চাই।" শুনতে পাওয়াটাই অনেক সময় অর্ধেক সমাধান।
কখন ও কার কাছে সাহায্য চাইবেন
- পরিবার বা পুরনো বন্ধু: যাঁদের আপনি বিশ্বাস করেন।
- কাজের জায়গার কেউ: সহকর্মী, তত্ত্বাবধায়ক বা মানবসম্পদের কাউকে। কাজের চাপ বা আচরণই কারণ হলে লিখিতভাবে জানান।
- স্বাস্থ্যসেবা: চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, যদি সম্ভব হয়। কোথায় পাবেন, সহকর্মী বা নিয়োগকর্তার কাছে জিজ্ঞেস করুন। স্বাস্থ্যসেবা ও বিমা নিয়ে দেখুন বিদেশে অসুস্থ হলে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে জানার কথা।
- বাংলাদেশ দূতাবাস: গুরুতর সমস্যা, অধিকার লঙ্ঘন বা বিপদের ক্ষেত্রে। দেখুন প্রবাসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেবাগুলো কী কী।
- জরুরি সেবা: নিজের ক্ষতি করার চিন্তা এলে বা জীবন সংশয়ে থাকলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে ফোন করুন।
বিপদে সাহায্য চাওয়ার আরও পথ আছে বিদেশে বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইবেন লেখায়।
পরিবারের জন্য একটি কথা
যাঁদের স্বজন প্রবাসে, তাঁরা শুধু টাকার কথা জিজ্ঞেস না করে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করুন, "তুমি কেমন আছ, ঘুম হচ্ছে, খেয়েছ?" প্রবাসীর পরিবারের পক্ষে সবচেয়ে বড় সাহায্য হলো তাঁকে শোনা, চাপ না বাড়ানো।
অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)
অভিবাসীদের সাহায্যের পথ ও স্বাস্থ্য নিয়ে আরও তথ্য এখানে দেখুন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।
- IOM: সাহায্য পেতে: অভিবাসীরা নিকটবর্তী আইওএম অফিসে যোগাযোগ করার পথ ও সাধারণ অনুসন্ধানের ফর্ম পাবেন। সাইটের লেখা ইংরেজিতে।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: প্রবাসী কর্মীদের জন্য সরকারি তথ্য ও যোগাযোগের নম্বর।