প্রবাসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেবাগুলো কী কী
পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট
বিদেশে থাকার সময় এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নিয়োগকর্তা বা কমিউনিটির সাহায্যে সমাধান হয় না: পাসপোর্ট হারানো, বেতন নিয়ে বড় বিবাদ, পাসপোর্ট আটকে রাখা, দুর্ঘটনা বা আটক হওয়া। তখন নিজের দেশের সরকারের প্রতিনিধি, অর্থাৎ বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশনই অনেক সময় প্রথম ভরসা হতে পারে।
কিন্তু অনেকে জানেন না দূতাবাস ঠিক কী কী করে, কীভাবে যোগাযোগ করতে হয়, আর কোন বিষয়ে সাহায্য আশা করা যায়। এই লেখায় সেই সাধারণ ধারণা দেওয়া হলো।
সতর্কতা: প্রতিটি দূতাবাসের সেবার তালিকা, কাজের সময়, ফি ও পদ্ধতি আলাদা হতে পারে এবং সময়ে সময়ে বদলাতে পারে। এই লেখায় কোনো নির্দিষ্ট ফি বা সময় দেওয়া হয়নি। আপনার দেশের দূতাবাসের নিজস্ব সাইটে বা সরকারি সূত্রে সর্বশেষ তথ্য দেখে নিন।
দূতাবাস আর মিশন বলতে কী বোঝায়
বিদেশে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী অফিসগুলো সাধারণত দূতাবাস (embassy), কনস্যুলেট বা হাইকমিশন নামে পরিচিত। সবগুলোকে একসঙ্গে মিশন বলা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইটে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর তালিকা অঞ্চল অনুযায়ী সাজানো আছে, যেমন পশ্চিম এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম ইউরোপ ও ইইউ, আমেরিকা, আফ্রিকা ইত্যাদি। কোন দেশে কোন মিশন আছে, তা সেখান থেকে খুঁজে পাবেন।
উদাহরণ হিসেবে পশ্চিম এশিয়ার পাতায় বাহরাইন, ইরান, ইরাক, জর্ডান ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের মিশনের নাম আছে এবং প্রতিটির নিজস্ব ওয়েবসাইটের লিঙ্ক দেওয়া আছে। ঠিকানা ও ফোন নম্বর তালিকার পাতায় নেই, ওগুলো দেখতে সংশ্লিষ্ট মিশনের নিজের সাইটে যেতে হবে।
দূতাবাস সাধারণত কী কী সাহায্য করে
দেশভেদে ও মিশনভেদে আলাদা হলেও এমন কিছু কাজ সাধারণত দূতাবাসের আওতায় থাকে:
- পাসপোর্ট ও পরিচয় সংক্রান্ত সেবা: পাসপোর্ট নবায়ন বা হারানো পাসপোর্টের বিকল্প। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইটে ই-পাসপোর্টের একটি অফলাইন আবেদন ফর্মের কথা দেওয়া আছে। তাই আপনার ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া, মিশনের সাইটে দেখুন।
- কাগজ সত্যায়ন ও নোটারি-সংক্রান্ত সহায়তা: কিছু কাগজ দেশে ব্যবহারের জন্য সত্যায়িত করা লাগে। কোন মিশনে এই সেবা মেলে, তা জেনে নিন।
- জরুরি সহায়তা: গুরুতর বিপদ, আটক হওয়া, দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ঘটনায় তথ্য দেওয়া ও সমন্বয়ে সাহায্য।
- প্রবাসী কর্মীর অভিযোগ বা সমস্যায় সহায়তা: বেতন না পাওয়া, চুক্তি ভাঙা, নিয়োগকর্তার দুর্ব্যবহার ইত্যাদিতে পরামর্শ ও সহায়তার চেষ্টা। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাইটের মেনুতে "শ্রম উইং" নামে একটি অংশ আছে। কোন দেশের মিশনে শ্রম বিষয়ক কর্মকর্তা আছেন, তা মিশনের সাইটে দেখুন।
- পরামর্শ: স্থানীয় আইন, নিয়োগকর্তা বা এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ ও অন্য সেবা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা।
দূতাবাস সবকিছু করে দিতে পারে, এমন আশা করা ঠিক নয়। সে দেশের আইন মানতে হয় আর দূতাবাসের ক্ষমতারও সীমা আছে। তবে প্রমাণ ও কাগজ গুছিয়ে গেলে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
কখন দূতাবাসে যোগাযোগ করবেন
- পাসপোর্ট হারালে বা চুরি হলে।
- নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট আটকে রাখলে বা আপনাকে আসল কাগজ ফেরত না দিলে।
- বেতন না পেলে বা চুক্তির শর্ত না মানলে, আর নিজে মিটাতে না পারলে।
- অন্যায়ভাবে আটক বা হয়রানির শিকার হলে।
- দুর্ঘটনা, গুরুতর অসুস্থতা বা মৃত্যুর ঘটনায়।
- কাগজ সত্যায়ন বা পাসপোর্ট সংক্রান্ত সেবা লাগলে।
বিপদের ধরন অনুযায়ী কী করবেন, তা পড়ুন বিদেশে বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইবেন লেখায়।
যোগাযোগের আগে প্রস্তুতি
- মিশনের সাইট ও যোগাযোগ খুঁজে রাখুন: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইট থেকে আপনার দেশের মিশনের নিজস্ব সাইট খুঁজে নিন। ঠিকানা, ফোন, ইমেইল, কাজের সময় ও ছুটির দিন দেখুন। নম্বর ফোনে সংরক্ষণ করুন।
- কাগজ তৈরি রাখুন: পাসপোর্ট, ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিটের কপি, চুক্তি, সমস্যার ঘটনার তারিখসহ সংক্ষিপ্ত বিবরণ, প্রমাণ (বার্তা, ছবি, বেতনের রেকর্ড)।
- ঘটনা সংক্ষেপে লিখে রাখুন: কে, কখন, কী করল: তারিখ ধরে একটি কাগজে। এতে অফিসারের বুঝতে সুবিধা হয়।
- আগে ফোন বা ইমেইল করুন: সরাসরি গেলে অনেক সময় লাগে। যোগাযোগের মাধ্যম ও সময় জেনে নিন।
- শান্ত ও ভদ্র থাকুন: সত্য ও স্পষ্টভাবে বলুন। কিছু লুকাবেন না।
কাগজের তালিকা ও নিরাপদে রাখার নিয়ম দেখুন প্রবাসে নিজের কাগজপত্র নিরাপদে রাখার নিয়ম লেখায়।
সেবার ফি
পাসপোর্ট নবায়ন, সত্যায়ন বা অন্য কিছু সেবায় ফি লাগতে পারে। ফি কত এবং কীভাবে দেবেন, তা মিশনের সাইট বা অফিসিয়াল সূত্রে দেখুন (যাচাই করুন)। ফি দেওয়ার পর রসিদ নিন। কেউ "দ্রুত করে দেব" বলে সরকারি ফির বাইরে টাকা চাইলে বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বললে রাজি হবেন না।
যেসব ফাঁদ থেকে সাবধান
- দূতাবাসের নামে ভুয়া যোগাযোগ: কেউ নিজেকে দূতাবাসের লোক বলে টাকা চাইলে আগে মিশনের অফিসিয়াল নম্বরে ফোন করে নিশ্চিত হোন।
- দালাল: "আমি দূতাবাসে চেনা, কাজ করিয়ে দেব" বলে ঘুষ বা বাড়তি টাকা চাওয়া।
- ভুয়া ফেসবুক পেজ: অফিসিয়াল নয় এমন পেজের কথায় বিশ্বাস না করে মন্ত্রণালয় ও মিশনের সাইটের তথ্য দেখুন।
প্রতারক চেনার আরও লক্ষণ পাবেন দালাল ও ভিসা প্রতারক চেনার লক্ষণ লেখায়।
অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)
মিশনের তালিকা, কনস্যুলার সেবা ও যোগাযোগের তথ্য এখানে দেখুন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: সাইটের মেনুতে অঞ্চল অনুযায়ী বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের তালিকা এবং নাগরিক ই-সেবা (কনস্যুলার সেবা) আছে।
- পশ্চিম এশিয়ার মিশনের তালিকা (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়): এই অঞ্চলের মিশনগুলোর নাম ও তাদের নিজস্ব সাইটের লিঙ্ক।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: প্রবাসী কর্মীদের অভিযোগের ব্যবস্থা ও যোগাযোগের তথ্য।