দালাল ও ভিসা প্রতারক চেনার লক্ষণ
পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট
ভিসা কিনতে গিয়ে সর্বস্ব হারানোর গল্প আমরা সবাই কমবেশি শুনেছি। জমি বিক্রি, ঋণ আর সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে "ভিসা" কিনলেন, তারপর দালাল ফোন বন্ধ করে দিল, বা ভুয়া ভিসা ধরা পড়ল বিমানবন্দরে। এই ধরনের প্রতারণা আটকাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো টাকা দেওয়ার আগে কিছু লক্ষণ চিনে ফেলা।
এই লেখায় প্রতারকদের পরিচিত কিছু কৌশল এবং সেগুলোর লক্ষণ দেওয়া হলো। এর সঙ্গে আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সি ও ভিসার প্রস্তাব যাচাইয়ের গাইড মিলিয়ে পড়লে আপনার সুরক্ষা আরও শক্ত হবে।
সতর্কতা: প্রতারকরা প্রায়ই অনেক বিশ্বাসযোগ্য সেজে আসে: কখনো আত্মীয়, কখনো পরিচিত "এজেন্সির লোক", কখনো ফেসবুকের জনপ্রিয় পেজ। একজন পরিচিত বা আত্মীয় বলছে বলেই কথাটা সত্য, ধরে নেবেন না। যাচাই সবসময় নিজে করুন।
লক্ষণ ১: "আজই টাকা দিন, নইলে সুযোগ চলে যাবে"
তাড়াহুড়ো প্রতারকের সবচেয়ে প্রিয় কৌশল। আপনি ভাবার সময় পেলে যাচাই করবেন, আর যাচাই করলে তার ধরা পড়ার ভয়। বৈধ কাজের ভিসার ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। "এখনই না দিলে ভিসা অন্য কাউকে দিয়ে দেব" ধরনের কথা শুনলে থামুন।
লক্ষণ ২: ভিজিট বা পর্যটক ভিসায় কাজের কথা
"আগে ভিজিটে চলে যান, পরে কাজের ভিসায় বদলে দেব" কথাটি বহু মানুষকে বিপদে ফেলেছে। অনেক দেশে পর্যটক ভিসায় কাজ করা বেআইনি, ধরা পড়লে জরিমানা, আটক বা ফেরত পাঠানো হতে পারে (দেশভেদে আলাদা, যাচাই করুন)।
লক্ষণ ৩: লাইসেন্স বা অফিস দেখাতে অনীহা
- এজেন্সির নাম ও লাইসেন্স নম্বর জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যায়।
- সরাসরি অফিসে নিতে চায় না, শুধু ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে কথা বলে।
- অফিসের ঠিকানা থাকলেও বাস্তবে সেখানে গিয়ে সেই এজেন্সির নাম মেলে না।
এজেন্সি বৈধ কি না, সরকারি তালিকা ও সংগঠনের তালিকা দুই জায়গাতেই মিলিয়ে দেখুন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাইটে এজেন্সির তালিকার লিঙ্ক আছে (নিচে সূত্র দেখুন)। BAIRA-র সাইটেও সদস্যদের তালিকা ও সন্ধানের সুবিধা আছে, তবে সেটা লাইসেন্স যাচাইয়ের একমাত্র উপায় নয়। তাই দুই দিক থেকেই মিলিয়ে নিন।
লক্ষণ ৪: ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা চাওয়া
- এজেন্সির নামে নয়, ব্যক্তির মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে টাকা চায়।
- রসিদ দিতে চায় না বা "পরে দেব" বলে।
- পুরো টাকা একবারে নগদে দিতে বলে।
সরকারি বা বৈধ এজেন্সির টাকা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় সাধারণত লিখিত হিসাব ও রসিদ থাকে। কী বাবদ কত দিচ্ছেন, প্রতিটার সই করা রসিদ নিন। টাকা পাঠানোর রসিদ কেন রাখবেন এবং কীভাবে, তা ভাবতে পড়তে পারেন বৈধ পথে টাকা পাঠানো কেন নিরাপদ লেখাটিও।
লক্ষণ ৫: "কিছু লাগবে না, সব হয়ে যাবে" বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি
- প্রশিক্ষণ, মেডিকেল বা নিবন্ধন না করেই "সব করিয়ে দেব"।
- অস্বাভাবিক বেশি বেতন, কোনো যোগ্যতা ছাড়াই কাজ, বিনা খরচে যাওয়া।
- "নিশ্চিত যাবেন, টাকা ফেরতযোগ্য" ধরনের মৌখিক আশ্বাস।
যা সত্য হতে পারে না বলে মনে হয়, সম্ভবত সেটা সত্য নয়। সরকারি ধাপগুলো (নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা) ফাঁকি দিয়ে যাওয়ার পথ বলে কিছু নেই। দেখুন বিএমইটি নিবন্ধন ও স্মার্ট কার্ড আর স্বাস্থ্য পরীক্ষার গাইড।
লক্ষণ ৬: আপনার আসল কাগজ আটকে রাখা
পাসপোর্ট, সনদ বা আসল কাগজ "জমা" নিয়ে ফেরত দিতে না চাওয়া ঝুঁকির লক্ষণ। প্রয়োজনে কাগজ জমা দিলে রসিদ নিন, কাজ শেষ হলে ফেরত নিন। এ নিয়ে বিস্তারিত পাবেন কাগজপত্রের তালিকা ও গোছানোর নিয়ম লেখায়।
লক্ষণ ৭: গোপন রাখতে বলা
"পরিবারকে বলবেন না", "কাউকে কিছু জানাবেন না", "যাচাই করতে যাবেন না" এই ধরনের কথা শুনলে বিপদ সংকেত ধরে নিন। বৈধ কাজের কিছু লুকানোর দরকার নেই। পরিবারের অন্তত একজনকে সব জানিয়ে রাখুন।
লক্ষণ ৮: ভুয়া কাগজ ও জালিয়াতি
- ভিসা, চাহিদাপত্র বা অফার লেটারে বানান ভুল, অস্পষ্ট ছাপ, অমিল তারিখ।
- কাজের চুক্তির নাম আর ভিসায় নিয়োগকর্তার নাম মেলে না।
- কাগজের শুধু ছবি দেখায়, আসল হাতে দিতে চায় না।
ভিসা আর চুক্তি মিলিয়ে দেখার ধাপগুলো আছে ভিসা ও কাজের চুক্তি মিলিয়ে দেখবেন কীভাবে লেখায়। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাইটে বিএমইটি-র মাধ্যমে অনলাইনে ভিসা যাচাইয়ের একটি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ আছে। এর বর্তমান পদ্ধতি নিজে দেখে নিন।
লক্ষণ ৯: সামাজিক মাধ্যমে "সুযোগ"
ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব ভিডিওতে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন, কমেন্টে "ইনবক্স করুন", অথবা পরিচিত কেউ আপনাকে "ভালো সুযোগ" নিয়ে ইনবক্সে ডেকে নেওয়া। এসবের পেছনে বৈধ এজেন্সি আছে কি না, না দেখে এগোবেন না।
ফাঁদে পড়ার আগে ৫টি প্রশ্ন
- এজেন্সি বা কোম্পানির নাম, লাইসেন্স ও ঠিকানা কি আমি নিজে যাচাই করেছি?
- আমি কি নিজের চোখে অফিসটি দেখেছি?
- প্রতিটা টাকার সই করা রসিদ কি পাচ্ছি?
- ভিসা ও চুক্তির নাম, পদ, বেতন কি মিলে যাচ্ছে?
- পরিবারের অন্তত একজন কি সবকিছু জানেন?
একটি উত্তর "না" হলে টাকা দেওয়া বন্ধ রাখুন।
ঠকে গেলে প্রথমে কী করবেন
- আরও টাকা দেবেন না। প্রতারকরা প্রায়ই বলে "আরেকটু দিলে সমস্যা মিটে যাবে"।
- সব প্রমাণ জমান: রসিদ, কথোপকথনের স্ক্রিনশট, ফোন নম্বর, ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের তথ্য।
- অভিযোগ করুন: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাইটে অনলাইনে অভিযোগের ব্যবস্থার কথা আছে। এর সঙ্গে প্রবাসী কর্মীদের জন্য একটি কল সেন্টারের নম্বর (দেশের ভেতরে টোল ফ্রি ১৬১৩৫) দেওয়া আছে। ফোন করার আগে সাইটে নম্বরটি মিলিয়ে নিন। পুলিশের কাছে অভিযোগ বা আইনি সাহায্যের পথ আপনার এলাকার প্রশাসনের কাছ থেকে জেনে নিন।
- বিদেশে থাকলে: সমস্যায় পড়লে সাহায্যের পথ জানতে পড়ুন বিদেশে বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইবেন।
লজ্জা বা ভয়ে চুপ করে থাকবেন না। প্রতারকরা ঠিক এই চুপ থাকার সুযোগটাই নেয়, আর যত দেরি হবে প্রমাণ জোগাড় তত কঠিন হবে।
অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)
এজেন্সির তালিকা, অভিযোগের তথ্য ও যোগাযোগের নম্বর এখানে দেখুন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: এজেন্সির তালিকা, অভিযোগের ব্যবস্থা ও কল সেন্টারের তথ্য।
- BAIRA: সদস্য এজেন্সির তালিকা: সংগঠনের সদস্য এজেন্সির তালিকা। এখানে নাম পাওয়া মানেই লাইসেন্স যাচাই হয়ে গেল, তা নয়। সরকারি তালিকাও মিলিয়ে নিন।