রিক্রুটিং এজেন্সি ও ভিসার প্রস্তাব যাচাই করবেন কীভাবে: ধাপে ধাপে গাইড
আপডেট: পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট
বিদেশে কাজের স্বপ্ন নিয়ে অনেকেই সর্বস্ব খরচ করেন। ভিসা, এজেন্সি, দালাল: এই ধাপেই সবচেয়ে বেশি প্রতারণা ঘটে। একবার টাকা চলে গেলে ফেরত পাওয়া খুব কঠিন। তাই টাকা দেওয়ার আগে যাচাই করার অভ্যাসটাই আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
এই লেখায় প্রতিটি ধাপ আলাদা করে দেওয়া হলো। কাজে নামার আগে ধাপগুলো নিজে মিলিয়ে নিন।
সতর্কতা: সরকারি নিয়ম, ফি-র সীমা, নিবন্ধনের ধাপ আর সংস্থার নাম সময়ে সময়ে বদলাতে পারে। এই লেখায় কোনো নির্দিষ্ট ফি বা সীমার অঙ্ক দেওয়া হয়নি। বর্তমান নিয়ম অবশ্যই মন্ত্রণালয় ও BMET এর অফিসিয়াল সূত্র থেকে যাচাই করুন।
ধাপ ১: এজেন্সির লাইসেন্স যাচাই
বাংলাদেশে বৈধভাবে কর্মী পাঠাতে হলে রিক্রুটিং এজেন্সির সরকারি অনুমোদন (লাইসেন্স) থাকতে হয়। দেখে নিন:
- এজেন্সির নাম ও লাইসেন্স নম্বর কী?
- লাইসেন্সের মেয়াদ কি আছে? বাতিল বা স্থগিত নয় তো?
- সরকারের অফিসিয়াল তালিকায় (প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও BMET এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) এজেন্সির নাম আছে কিনা (যাচাই করুন)।
- এজেন্সির ঠিকানা কি বাস্তবে আছে? শুধু ফেসবুক পেজ বা মোবাইল নম্বর থাকলে সতর্ক হোন।
কেউ নিজেকে "এজেন্সির লোক" পরিচয় দিলে তার পরিচয়ও আলাদা করে যাচাই করুন। এজেন্সির অফিসে গিয়ে সরাসরি দেখা করুন।
ধাপ ২: ভিসার ধরন ও সত্যতা
- কাজের ভিসা কিনা: পর্যটক (ভিজিট) ভিসায় কাজ করা বেআইনি। "আগে ভিজিটে চলে যান, পরে কাজের ভিসা হয়ে যাবে" শুনলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান।
- নিয়োগকর্তা কে: কোম্পানির নাম, ঠিকানা আর কাজের ধরন কী, লিখিত নিন।
- ভিসা ও চাহিদাপত্রের সত্যতা: অনেক দেশে ভিসা অনলাইনে বা দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করা যায়। আপনার গন্তব্য দেশে এই ব্যবস্থা কী, তা অফিসিয়াল সূত্র থেকে জেনে নিন (যাচাই করুন)। বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংও সাহায্য করতে পারে।
ধাপ ৩: চুক্তি
মুখের কথায় বিশ্বাস নয়, সব লিখিত নিন। চুক্তিতে অবশ্যই যা থাকবে:
- নিয়োগকর্তার নাম ও ঠিকানা, আপনার পদ ও কাজের বিবরণ
- বেতন (কত, কখন, কীভাবে দেওয়া হবে), ওভারটাইম
- চুক্তির মেয়াদ, ছুটি, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা
- দেশে ফেরার টিকিট কে দেবে
- চুক্তি ভাঙলে কী হবে
চুক্তি ও অন্যান্য কাগজের ছবি তুলে ফোনে ও ইমেইলে রাখুন, আর পরিবারের কাছেও একটা কপি দিন। আপনি যে ভাষা বোঝেন না, সেই ভাষার কাগজে সই করার আগে বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে অনুবাদ করিয়ে নিন।
ধাপ ৪: টাকার লেনদেন
- কী বাবদ কত টাকা দিচ্ছেন, লিখিত হিসাব নিন।
- প্রতিটি টাকার জন্য সই করা রসিদ নিন।
- সম্ভব হলে ব্যাংকের মাধ্যমে দিন, যাতে প্রমাণ থাকে। বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন এড়ান।
- সরকার নির্ধারিত কোনো সর্বোচ্চ খরচ বা ফি থাকলে তা কত, অফিসিয়াল সূত্রে দেখে নিন (যাচাই করুন)। সেই সীমার চেয়ে বেশি চাইলে কারণ জানতে চান ও লিখিত নিন।
- পুরো টাকা একসঙ্গে আগে দেবেন না। ধাপ অনুযায়ী দিন এবং কাগজ হাতে পেয়ে দিন।
ধাপ ৫: সরকারি প্রক্রিয়া
বৈধভাবে বিদেশে যেতে সাধারণত কয়েকটি সরকারি ধাপ পার হতে হয়, যেমন BMET-এ নিবন্ধন (আঙুলের ছাপসহ), অনুমোদিত কেন্দ্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দেশ ছাড়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ছাড়পত্র। ধাপের নাম, খরচ ও নিয়ম সময়ে সময়ে বদলাতে পারে, তাই বর্তমান তালিকা BMET ও মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে দেখে নিন (যাচাই করুন)। কেউ বলে "এসব লাগবে না, আমি সব ম্যানেজ করে দেব", সেটা বিপদের সংকেত।
বিপদের লক্ষণ (লাল পতাকা)
- এজেন্সির লাইসেন্স দেখাতে না চাওয়া বা পরিষ্কার উত্তর না দেওয়া
- ভিজিট বা পর্যটক ভিসায় কাজের কথা বলা
- রসিদ বা চুক্তি দিতে না চাওয়া
- খুব তাড়াহুড়ো করা: "আজই টাকা দিন, নইলে ভিসা চলে যাবে"
- অস্বাভাবিক বেশি টাকা চাওয়া বা বেতনের অবাস্তব প্রতিশ্রুতি
- শুধু ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ফোনে যোগাযোগ, অফিসে বসতে না দেওয়া
- ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা চাওয়া
- "কিছুই লাগবে না, সব হয়ে যাবে" ধরনের কথা
সতর্কতা: আপনি কোনো প্রস্তাবে আগ্রহী জানলেই অনেক প্রতারক বন্ধু বা আত্মীয় সেজে যোগাযোগ করে। "আমার পরিচিত লোক আছে" শুনে চোখ বন্ধ করে টাকা দেবেন না। প্রতিটা ধাপ নিজে যাচাই করুন।
দেওয়ার আগে ১০টি প্রশ্নের তালিকা
- এজেন্সির সরকারি লাইসেন্স আছে কি, মেয়াদ ঠিক আছে কি?
- অফিস বাস্তবে আছে কি, আমি নিজে গিয়েছি কি?
- ভিসাটা কাজের ভিসা কি?
- নিয়োগকর্তার নাম, ঠিকানা ও চাহিদাপত্র কি আমি পেয়েছি?
- চুক্তিতে বেতন ও সুবিধা পরিষ্কার লেখা আছে কি?
- চুক্তি কি আমি পুরোটা বুঝে সই করছি?
- প্রতিটি টাকার রসিদ কি পাচ্ছি?
- খরচ কি সরকারি সীমার ভেতরে (যাচাই করেছি)?
- সরকারি প্রক্রিয়ার সব ধাপ (নিবন্ধন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ছাড়পত্র) কি হচ্ছে?
- পরিবারের কেউ কি পুরো বিষয়টা জানে এবং সব কাগজের কপি রেখেছে?
একটা প্রশ্নের উত্তরও "না" বা "জানি না" হলে টাকা দেওয়ার আগে থামুন। পড়ুন আমাদের কোন দেশে কাজ করতে যাবেন লেখাটিও।
অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)
এই লেখার তথ্য মিলিয়ে নিতে নিচের অফিসিয়াল সাইট দেখতে পারেন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: প্রবাসী কর্মী ও বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।
- BAIRA (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ): রিক্রুটিং এজেন্সিদের সংগঠনের ওয়েবসাইট। এটা এজেন্সিদের নিজস্ব সংগঠন, সরকারি সংস্থা নয়, তাই এখানকার তথ্যও সরকারি সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।