প্রবাসীর মৃত্যু হলে দেহ দেশে আনা ও ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া
পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট
বিদেশে কোনো প্রবাসীর মৃত্যুর খবর একটি পরিবারের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়ের একটি। শোকের মধ্যেই পরিবারকে বহু কাজ সামলাতে হয়: খবর নিশ্চিত করা, দেহ দেশে আনা, কাগজ জোগাড়, আর পাওনা বা ক্ষতিপূরণের বিষয় বোঝা। এই লেখা পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও সহকর্মীদের জন্য একটি সাধারণ দিকনির্দেশনা। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়, আর প্রতিটি ঘটনা আলাদা।
সতর্কতা: প্রক্রিয়া, সময়, খরচ ও ক্ষতিপূরণ দেশ, ঘটনার ধরন, চুক্তি ও বিমার ওপর নির্ভর করে এবং এখানে কোনো অঙ্ক বা সময় বলা হয়নি। প্রকৃত তথ্যের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করুন। 'দ্রুত দেহ এনে দেব' বা 'ক্ষতিপূরণ ছাড়িয়ে দেব' বলে আগাম টাকা চাওয়া কাউকে বিশ্বাস করবেন না।
খবর পাওয়ার পর প্রথমে যা করবেন
- খবর নিশ্চিত করুন। খবর কার কাছ থেকে এসেছে: নিয়োগকর্তা, সহকর্মী, কমিউনিটি, নাকি দূতাবাস? তাঁদের নাম ও যোগাযোগের নম্বর লিখে রাখুন।
- বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করুন। মৃত ব্যক্তির সম্পূর্ণ নাম, পাসপোর্ট নম্বর, নিয়োগকর্তার নাম ও যেখানে মৃত্যু হয়েছে সেই শহর জানান। দেখুন প্রবাসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেবাগুলো কী কী। মিশনের তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইটে আছে।
- দেশে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থায় জানান। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এই ধরনের ক্ষেত্রে সহায়তার ভূমিকা রাখে। বোর্ডের পরিচিতি পাবেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সেবা কী কী লেখায়।
- রিক্রুটিং এজেন্সিকে জানান। যে এজেন্সির মাধ্যমে তিনি গিয়েছিলেন, তাঁদেরও জানান।
- পরিবারের একজন প্রতিনিধি ঠিক করুন। সব যোগাযোগ একজনের মাধ্যমে হলে তথ্য এলোমেলো হয় না।
দেহ দেশে আনার সাধারণ ধাপ
- স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (পুলিশ বা স্বাস্থ্য বিভাগ) মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে এবং প্রয়োজনীয় সনদ দেয়। দুর্ঘটনা বা সন্দেহজনক ক্ষেত্রে তদন্ত ও শব ব্যবচ্ছেদ লাগতে পারে, তাতে সময় বাড়ে।
- বাংলাদেশ দূতাবাস সাধারণত কাগজের যাচাই, ছাড়পত্র ও যোগাযোগে সহায়তা করে।
- দেহ দেশে আনার খরচ ও ব্যবস্থা কে বহন করবে, তা নিয়োগকর্তার দায়, চুক্তি, বিমা ও সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করে। কে কী করবে, জানতে লিখিতভাবে চান (যাচাই করুন)।
- বিমানে দেহ পরিবহনের ব্যবস্থা এয়ারলাইন ও স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী হয়।
- দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে দেহ গ্রহণের ব্যবস্থা সম্পর্কে আগে জেনে নিন। দেখুন বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের জন্য সরকারি সেবা ও সুবিধা।
- কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবার ওই দেশেই দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেটি পরিবারের সিদ্ধান্ত এবং স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী।
কী কাগজ লাগতে পারে
- মৃত্যুসনদ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অন্যান্য সনদ।
- পাসপোর্টের কপি, ভিসা বা বাসস্থান অনুমতি।
- চুক্তি ও নিয়োগকর্তার প্রমাণ।
- পরিবারের সদস্যদের পরিচয়পত্র ও সম্পর্কের প্রমাণ (জন্মনিবন্ধন, বিয়ের কাগজ ইত্যাদি)। দেখুন প্রবাসীদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও সন্তানের জন্মনিবন্ধন ও কাগজপত্র।
- বিদেশি কাগজের অনুবাদ ও সত্যায়ন, যা বিদেশ থেকে দেশে আনা বা দেশ থেকে বিদেশে পাঠাতে লাগতে পারে। দেখুন দেশের কাগজপত্র বিদেশ থেকে সত্যায়িত করার নিয়ম।
- সঠিক তালিকা দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে নিন।
ক্ষতিপূরণ ও পাওনা
ক্ষতিপূরণ বা পাওনা বিভিন্ন উৎস থেকে আসতে পারে, তবে কোনোটিই নিশ্চিত নয়। নির্ভর করে ঘটনার ধরন (কাজের দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা অন্য কারণ), দেশের আইন, চুক্তি ও বিমার ওপর।
- নিয়োগকর্তার কাছ থেকে: বকেয়া বেতন, চুক্তি-শেষের সুবিধা, ছুটির পাওনা, কাজের দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ। দেখুন স্থায়ীভাবে দেশে ফেরার আগে বিদেশের পাওনা বুঝে নেওয়ার তালিকা।
- বিমা থেকে: কর্মক্ষেত্রে বা জীবনবিমা থাকলে। দেখুন প্রবাসীর জন্য জীবনবিমা সম্পর্কে জানার কথা।
- সরকারি বা কল্যাণ সহায়তা: প্রবাসী কল্যাণ ব্যবস্থার আওতায় কোনো সহায়তা পাওয়া যায় কি না, তা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের কাছ থেকে জানুন।
- ব্যাংক ও সঞ্চয়: মৃত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের টাকা উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী ভাগ হয়। প্রক্রিয়া ব্যাংকের কাছ থেকে জানুন।
সতর্কতা
- শোকের সময় প্রতারকরা সুযোগ নেয়। আগাম টাকা চাওয়া মধ্যস্থতাকারীকে বিশ্বাস করবেন না।
- কাগজে সই করার আগে বিষয়বস্তু বুঝে নিন; কেউ "সব মিটমাট" বলে সইয়ের জন্য চাপ দিলে সময় নিন।
- সব কথা, কাগজ ও রসিদ লিখে রাখুন।
- পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য ও প্রয়োজনে আইনজীবীর সাহায্য নিন।
পরিবারের জন্য সহায়তা
- আর্থিক দিক: নিকটাত্মীয়রা মিলে সামলান। দেখুন পরিবারের মাসিক খরচের বাজেট।
- মানসিক সহায়তা: শোক সামলাতে সময় লাগে। বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলুন, প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নিন।
- বিদেশে বিপদে সহায়তার সাধারণ পথ জানতে দেখুন বিদেশে বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইবেন।
আগে থেকে প্রস্তুতি
অপ্রিয় হলেও কিছু প্রস্তুতি পরিবারকে বিপদে সাহায্য করে: কাগজপত্রের কপি পরিবারের কাছে রাখা, নিয়োগকর্তা ও এজেন্সির তথ্য জানানো, উত্তরাধিকারীদের নাম বিমা বা ব্যাংকে স্পষ্ট রাখা। দেখুন প্রবাসে নিজের কাগজপত্র নিরাপদে রাখার নিয়ম।
অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)
এই তথ্যগুলো বদলাতে পারে, তাই সিদ্ধান্তের আগে সরকারি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সাইটে মিলিয়ে নিন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনের তালিকা এবং কনস্যুলার সেবার তথ্য।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: প্রবাসী কর্মীদের জন্য সরকারি তথ্য, সেবা ও অভিযোগের ব্যবস্থা।
- আইওএম (আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা): সাহায্য: অভিবাসী ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সাহায্যের তথ্য।
- বাংলাদেশ ব্যাংক: রেমিট্যান্স, ব্যাংকিং সুবিধা ও গ্রাহকের অভিযোগ কেন্দ্রের তথ্য।