কোন দেশে কাজ করতে যাবেন? বেছে নেওয়ার আগে ৭টি বিষয় যাচাই করুন
আপডেট: পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট
বিদেশে কাজে যাওয়ার কথা ভাবলে প্রথম প্রশ্নই থাকে, "কোন দেশে গেলে ভালো হবে?" কেউ বলেন এই দেশ, কেউ বলেন ওই দেশ। কিন্তু সত্যি কথা হলো, সবার জন্য একটা "সেরা দেশ" নেই। যে দেশ একজন রাজমিস্ত্রির জন্য ভালো, সেটা একজন নার্সের জন্য ভালো না-ও হতে পারে।
তাই এই লেখায় আমরা কোনো দেশকে এক নম্বর বা দুই নম্বর বলে সাজাচ্ছি না। কারণ বেতন, ভিসার নিয়ম আর কাজের চাহিদা প্রায়ই বদলায়, আর পুরনো তথ্য মানুষকে বিপদে ফেলে। বদলে আপনাকে দিচ্ছি এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর মিলিয়ে আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
১. আগে নিজেকে চিনুন
দেশ বাছার আগে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করুন:
- দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা: আপনি কোন কাজ ভালো পারেন? কত বছরের অভিজ্ঞতা আছে? কোনো সার্টিফিকেট বা প্রশিক্ষণ আছে কি?
- ভাষা: ইংরেজি, আরবি বা স্থানীয় ভাষার কতটুকু জানেন? ভাষা জানা থাকলে কাজ পাওয়া ও সুবিধা আদায় দুটোই সহজ হয়।
- বাজেট: যাওয়ার খরচ জোগাড় করতে কতটা ঋণ বা জমি বন্ধক লাগবে? ঋণ যত বড়, ঝুঁকি তত বেশি।
- স্বাস্থ্য ও বয়স: কিছু কাজে শারীরিক পরিশ্রম বেশি, আবহাওয়াও কঠিন হতে পারে।
- লক্ষ্য: কত বছর থাকতে চান? কত টাকা জমিয়ে কী করবেন? লক্ষ্য না থাকলে বছরের পর বছর কেটে যায়, অথচ হাতে কিছু থাকে না।
২. সেখানে আপনার কাজের চাহিদা আছে কি?
নির্মাণ, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, গৃহকর্ম, ড্রাইভিং, কারখানা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি: প্রতিটি দেশে ও প্রতিটি সময়ে কাজের চাহিদা আলাদা। কোন দেশে আপনার পেশায় লোক নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে এই উৎসগুলো দেখুন:
- সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (BMET) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (যাচাই করুন)
- ওই দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য
- সদ্য ওই দেশ থেকে ঘুরে আসা বা সেখানে কাজ করছেন, এমন বিশ্বস্ত মানুষ
ফেসবুক গ্রুপ বা ইউটিউব ভিডিওর "এখন অনেক লোক নিচ্ছে" কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেবেন না। সেগুলো পুরনো বা বিজ্ঞাপন হতে পারে।
৩. যাওয়ার মোট খরচ কত, আর তা বৈধ কিনা?
এখানেই সবচেয়ে বেশি প্রতারণা হয়। এজেন্সিকে কী বাবদ কত টাকা দিচ্ছেন, তা লিখিত নিন। সরকার নির্ধারিত কোনো সর্বোচ্চ ফি থাকলে সেটা কত, তা অফিসিয়াল সূত্র থেকে যাচাই করুন। কেউ অস্বাভাবিক বেশি চাইলে থেমে যান। বিস্তারিত দেখুন আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সি ও ভিসা যাচাইয়ের লেখায়।
৪. বেতন আর সুবিধা: কাগজে কী লেখা আছে?
"বেতন ভালো" শুনে নয়, চুক্তিতে কী লেখা আছে সেটা দেখুন:
- মূল বেতন কত, আর তা মাসের কোন তারিখে, কোন পদ্ধতিতে (ব্যাংক বা নগদ) দেওয়া হবে?
- ওভারটাইম আছে কি? থাকলে তার হার ও কাজের ঘণ্টা কত?
- থাকার জায়গা, খাবার ও যাতায়াত কে দেবে?
- চিকিৎসা বা বীমার সুবিধা আছে কি?
- সাপ্তাহিক ছুটি, বার্ষিক ছুটি আর দেশে যাওয়ার টিকিট কে দেবে?
- চুক্তির মেয়াদ কত বছর, আর শেষে পাওনা কী কী?
নিজে হিসাব করে দেখুন
বেতনের অঙ্কের চেয়ে জরুরি হলো, মাস শেষে আপনার হাতে কত জমবে। সহজ হিসাব:
- মাসে জমানো টাকা = মাসের মোট আয় − মাসের মোট খরচ − ঋণের কিস্তি
- যাওয়ার খরচ উঠতে কত মাস = যাওয়ার মোট খরচ ÷ মাসে জমানো টাকা
দুটো দেশের প্রস্তাব এই সূত্রে ফেলে তুলনা করলে দেখবেন, বেশি বেতনের দেশেও থাকা-খাওয়ার খরচ বেশি হওয়ায় জমানো টাকা কম হতে পারে। হিসাবের সংখ্যাগুলো অবশ্যই চুক্তি ও ওই দেশের বাস্তব খরচ থেকে নিন, আন্দাজে নয়।
৫. আইনি সুরক্ষা ও অধিকার কেমন?
- নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের উপর আপনার ভিসা কতটা নির্ভরশীল? অনেক দেশে কাজ বদল করা কঠিন বা নিয়মের অধীন। আগে জেনে নিন।
- আপনার পাসপোর্ট কার কাছে থাকবে? (এটা নিয়ে সতর্ক থাকুন, দেশভেদে আইন আলাদা, যাচাই করুন)
- শ্রম আদালত বা শ্রম দপ্তরে অভিযোগ করার ব্যবস্থা আছে কি?
- ওই দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও শ্রম কল্যাণ সহায়তার ব্যবস্থা কেমন?
বিপদে পড়লে কার কাছে যাবেন, তা আগেই জেনে রাখতে পড়ুন বিদেশে বিপদে সাহায্য পাওয়ার পথ।
৬. পরিবার ও জীবনযাত্রা
- পরিবারকে সঙ্গে নেওয়া যায় কি? গেলে কী শর্ত?
- আবহাওয়া, খাবার, ধর্মীয় সুবিধা ও ভাষা আপনার সঙ্গে মানাবে কি?
- সেখানে বাংলাদেশি কমিউনিটি আছে কি, যাদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া যায়?
৭. দেশে টাকা পাঠানো কতটা সহজ?
উপার্জন করে লাভ নেই, যদি নিরাপদে দেশে পাঠানো না যায়। ওই দেশে বৈধ পথে (ব্যাংক, লাইসেন্সপ্রাপ্ত এক্সচেঞ্জ হাউজ, অ্যাপ) টাকা পাঠানোর সুবিধা কেমন, ফি কত, কতক্ষণ লাগে, তা আগে জেনে নিন। পড়ুন টাকা পাঠানোর উপায় তুলনা করার ৫টি প্রশ্ন।
নিজের জন্য স্কোর করুন
একটা কাগজে ওপরের সাতটা বিষয় লিখুন। যে দেশগুলো ভাবছেন, প্রতিটার জন্য প্রতিটি বিষয়ে ১ থেকে ৫ নম্বর দিন (১ = খারাপ, ৫ = ভালো)। নম্বরগুলো আপনার নিজের যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে দিন। তারপর যোগ করুন। যোগফল বেশি হলেই যে সিদ্ধান্ত পাকা, তা নয়, তবে কোন দেশে কোন দিকটা দুর্বল, তা পরিষ্কার দেখতে পাবেন।
সতর্কতা: "১০০% ভিসা নিশ্চিত", "টাকা ফেরতের গ্যারান্টি" বা "পর্যটক ভিসায় গিয়ে কাজ" জাতীয় প্রস্তাব থেকে দূরে থাকুন। সহজ পথ দেখালেই সেটা নিরাপদ নয়। এ ধরনের প্রস্তাবে অনেকে টাকা হারান, কেউ কেউ বিদেশে আটকা পড়েন।
আমাদের সাইটে যে দেশগুলো নিয়ে লিখছি
আমরা প্রথমে এই দেশগুলোর প্রবাসীদের প্রয়োজনের দিকে নজর দিচ্ছি: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিটা দেশের পাতায় ওই দেশ নিয়ে আমাদের সব লেখা পাবেন।
অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)
এই লেখার তথ্য মিলিয়ে নিতে নিচের অফিসিয়াল সাইট দেখতে পারেন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: প্রবাসী কর্মী ও বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।