মূল লেখায় যান
সাবাশ বাংলাদেশ
পরিবার ও দেশে ফেরা

দেশে ফেরার আগে আর্থিক পরিকল্পনা কীভাবে শুরু করবেন

আপডেট: পড়তে সময় লাগবে প্রায় ৫ মিনিট

দেশে ফেরার আগে আর্থিক পরিকল্পনা কীভাবে শুরু করবেন

বিদেশে কাজের কথা ভাবলে আমরা বেশি ভাবি যাওয়ার কথা, কিন্তু ফেরার কথা ভাবি কম। অথচ একদিন ফিরতেই হয়: চুক্তি শেষ হতে পারে, স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে পারে, কাজ হারাতে পারেন, কিংবা পরিবারের কাছে ফিরে আসতে চাইতে পারেন। ফেরার পর যাঁদের হাতে পরিকল্পনা থাকে, তাঁরা সহজে নতুন করে দাঁড়াতে পারেন।

এই লেখায় কোনো নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক বা "এত টাকা জমালেই নিরাপদ" ধরনের হিসাব নেই। কারণ প্রত্যেকের পরিবার, খরচ আর লক্ষ্য আলাদা। আছে পরিকল্পনা করার ধাপগুলো।

প্রথম প্রশ্ন: কী কারণে ফিরছেন?

ফেরার ধরনের ওপর পরিকল্পনা বদলায়:

  • নিজের ইচ্ছায়, পরিকল্পনা করে: আপনার হাতে সময় আছে। এক-দুই বছর আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে পারেন।
  • চুক্তি শেষ হয়ে বা কাজ হারিয়ে: সময় কম, তাই জরুরি তহবিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
  • অসুস্থতা বা পারিবারিক কারণে হঠাৎ: চিকিৎসা ও পরিবারের খরচের জন্য আলাদা ব্যবস্থা দরকার।

ধাপ ১: নিজের আর্থিক ছবিটা পরিষ্কার করুন

একটা কাগজ বা খাতায় লিখুন:

  • এখন মোট সঞ্চয় কত, কোথায় কোথায় আছে (ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, জমি, নগদ)?
  • দায় বা ঋণ কত, কার কাছে, কত মাস বাকি?
  • মাসে পরিবারের কত টাকা লাগে?
  • দেশে কোনো নিয়মিত আয়ের উৎস আছে কি (ভাড়া, দোকান, জমির ফসল)?

ধাপ ২: জরুরি তহবিল আলাদা রাখুন

ফেরার পর নতুন আয় শুরু হতে সময় লাগে। এই সময় সংসার চালানোর টাকা যেন ব্যবসার পুঁজি থেকে না কাটতে হয়। আর্থিক পরামর্শকরা সাধারণত কয়েক মাসের মাসিক খরচ আলাদা তহবিলে রাখার কথা বলেন। কত মাসের খরচ রাখবেন, তা আপনার পরিবারের অবস্থা বুঝে ঠিক করুন। এই টাকা ব্যবসায় বা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় লাগাবেন না।

সহজ হিসাব: জরুরি তহবিল = মাসিক খরচ × যত মাস চালাতে চান।

ধাপ ৩: ফেরার পর আয়ের পথ ঠিক করুন

ফিরে কী করে আয় করবেন, এই প্রশ্নের উত্তর যত আগে ঠিক হবে, তত ভালো:

  • চাকরি: বিদেশে শেখা দক্ষতা দেশে কোথায় কাজে লাগবে? কোন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারেন?
  • ছোট ব্যবসা: কোন ধরনের ব্যবসা চেনেন? আপনার এলাকায় কিসের চাহিদা আছে?
  • কৃষি বা পারিবারিক পেশা: জমি বা পারিবারিক ব্যবসা থাকলে তাতে যুক্ত হওয়া।
  • নতুন দক্ষতা শেখা: বিদেশে থাকতেই অনলাইনে বা প্রশিক্ষণে নতুন কিছু শিখে নিন।

ধাপ ৪: ব্যবসা শুরু করলে যে নিয়মগুলো মানবেন

  • ছোট করে শুরু করুন: সব সঞ্চয় একসঙ্গে ঢেলে দেবেন না। ব্যবসা ভালো চললে ধীরে ধীরে বাড়ান।
  • আগে বাজার বুঝুন: কারা কিনবে, দাম কত, কারা প্রতিযোগী, কিছুদিন দেখে নিন।
  • অংশীদারের সঙ্গে লিখিত চুক্তি: আত্মীয় হলেও, কে কত টাকা দিচ্ছে, লাভ-ক্ষতি কীভাবে ভাগ হবে, লিখে রাখুন।
  • ব্যবসা ও সংসারের টাকা আলাদা রাখুন।
  • হিসাব রাখুন: প্রতিদিনের আয়-ব্যয় লিখে রাখুন।
সতর্কতা: ফেরার পর "আমার টাকা খাটালে দ্বিগুণ হবে", "নিশ্চিত লাভের ব্যবসা" বলে অনেকে আসবেন। অনেক প্রবাসী এভাবে সর্বস্ব হারিয়েছেন। যে প্রস্তাবে আপনি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না, সেখানে টাকা দেবেন না। সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ নিজের নামে ও নিরাপদ জায়গায় রাখুন।

ধাপ ৫: বিনিয়োগে ঝুঁকি ছড়িয়ে দিন

পুরো টাকা এক জায়গায় রাখবেন না। কিছু ব্যাংকে, কিছু নিরাপদ সঞ্চয়পরিকল্পনায়, কিছু আয়ের উৎসে। জমি কিনতে চাইলে পড়ুন জমি কেনার যাচাই-তালিকা। নিজের নামে ব্যাংক হিসাব না থাকলে পড়ুন প্রবাসী ব্যাংক হিসাব লেখাটি।

ধাপ ৬: কাগজপত্র ও পাওনা গুছিয়ে নিন

  • বিদেশের শেষ পাওনা: চাকরির মেয়াদ শেষে প্রাপ্য সুবিধা (যেমন সার্ভিস শেষে বেনিফিট বা চুক্তি অনুযায়ী পাওনা) কী, চুক্তি ও ওই দেশের শ্রম নিয়মে যাচাই করুন। ছাড়ার আগে লিখিত হিসাব নিন (যাচাই করুন)।
  • ব্যাংক হিসাব: বিদেশের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করবেন, নাকি রাখবেন, এবং জমানো টাকা বৈধ পথে দেশে আনার পদ্ধতি ঠিক করুন।
  • বিদেশ থেকে মালপত্র আনা: আনার সময় শুল্ক ও সীমা সংক্রান্ত নিয়ম আছে। অফিসিয়াল সূত্র থেকে আগে জেনে নিন (যাচাই করুন)।
  • পরিচয় ও আয়ের কাগজ: বিদেশের কাজের সনদ, বেতনের প্রমাণ, রেসিডেন্স কাগজ সংরক্ষণ করুন, দেশে ঋণ বা অন্য সুবিধা নিতে কাজে লাগতে পারে।

ধাপ ৭: সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা খুঁজে দেখুন

ফেরত আসা প্রবাসীদের জন্য কিছু ঋণ, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন সহায়তা থাকতে পারে। যেমন প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রবাসীদের জন্য কী কী সুযোগ দেয়, তা তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেখুন। শর্ত, সুদের হার ও আবেদনের নিয়ম আমরা এখানে দিচ্ছি না (যাচাই করুন)।

ধাপ ৮: পরিবারের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা

ফেরা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে আগে কথা বলুন। আয় কমলে খরচ কীভাবে চলবে, কোথায় থাকবেন, সন্তানের পড়াশোনা কীভাবে চলবে, এসব বিষয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিন। পরিবারের প্রত্যাশা আর আপনার সামর্থ্যের মধ্যে ফারাক থাকলে আগেই পরিষ্কার করুন।

এক পাতার পরিকল্পনা (নিজে লিখে ফেলুন)

  1. কবে ফিরব (আনুমানিক সময়)?
  2. এখন মোট সঞ্চয় ও দায় কত?
  3. জরুরি তহবিল কত মাসের, কত টাকা?
  4. ফিরে আয়ের পথ কী?
  5. বিদেশে কোন কোন পাওনা বা কাগজ গুছিয়ে নিতে হবে?
  6. কোথায় থাকব, পরিবারের খরচ কীভাবে চলবে?
  7. কার কাছ থেকে পরামর্শ বা সহায়তা নেব?

অফিসিয়াল সূত্র (নিজে যাচাই করুন)

এই লেখার তথ্য মিলিয়ে নিতে নিচের অফিসিয়াল সাইট দেখতে পারেন। লিঙ্কগুলো নতুন ট্যাবে খুলবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

উত্তরগুলো খোলা আছে। কোনো প্রশ্নে চাপ দিলে সেটা বন্ধ হবে, আবার চাপলে খুলবে।

কত টাকা সঞ্চয় নিয়ে ফিরলে নিরাপদ?
এর কোনো একক অঙ্ক নেই। এটা আপনার পরিবারের সদস্য সংখ্যা, মাসিক খরচ, ঋণ আর ফিরে আয়ের পথের ওপর নির্ভর করে। লেখার মধ্যে দেওয়া সূত্রে আপনার জরুরি তহবিল হিসাব করুন (মাসিক খরচ × কত মাস চালাতে চান), তারপর সেই অনুযায়ী লক্ষ্য ঠিক করুন।
ফিরে কি ব্যবসা করা ভালো, নাকি চাকরি?
দুটোর কোনোটাই সবার জন্য ভালো নয়। ব্যবসায় ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুটোই বেশি। চাকরিতে নিয়মিত আয় কিন্তু সুযোগ সীমিত। আপনার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, পুঁজি আর ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য দেখে সিদ্ধান্ত নিন। অনেকে চাকরির পাশাপাশি ছোট করে ব্যবসা শুরু করেন।
বিদেশের চাকরির শেষ পাওনা কীভাবে পাব?
এটা আপনার চুক্তি, নিয়োগকর্তা ও ওই দেশের শ্রম নিয়মের ওপর নির্ভর করে। ছাড়ার আগে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে লিখিত হিসাব নিন। সমস্যা হলে ওই দেশের শ্রম দপ্তর ও বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করুন। সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও সময়সীমা দেশভেদে আলাদা, তাই অফিসিয়াল সূত্র থেকে যাচাই করুন।
পরিবার আমার পাঠানো টাকা সব খরচ করে ফেলেছে, এখন কী করব?
এই পরিস্থিতি অনেক প্রবাসীর। রাগ বা দোষারোপের আগে শান্তভাবে পরিবারের সঙ্গে বসে কত টাকা কোথায় গেছে তার হিসাব নিন। তারপর নতুন করে বাজেট ও লক্ষ্য ঠিক করুন। ভবিষ্যতে সঞ্চয়ের একটা অংশ নিজের নামে নিজের হিসাবে রাখুন। এটা অবিশ্বাস নয়, আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
ফিরে আসা প্রবাসীদের জন্য কি সরকারি ঋণ বা সহায়তা আছে?
প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ঋণ ও সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে পারে (যেমন প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম)। কী কী সুবিধা, কারা যোগ্য, শর্ত ও সুদের হার কী, তা আমরা এখানে দিচ্ছি না। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অফিসিয়াল সূত্র থেকে বর্তমান তথ্য যাচাই করুন।

লেখাটি শেয়ার করুন

হোয়াটসঅ্যাপ ফেসবুক মেসেঞ্জার

পরিবার ও দেশে ফেরা

দেশে ফিরে নতুন করে শুরু করার ছোট ব্যবসার ধারণা

প্রবাস থেকে ফিরে কী ধরনের ছোট ব্যবসা বা কাজ ভেবে দেখতে পারেন, কোন ধারণা কার জন্য উপযোগী, কীভাবে বাছাই করবেন এবং ঝুঁকি কী...

পরিবার ও দেশে ফেরা

সন্তানের পড়াশোনার জন্য প্রবাসী বাবা-মায়ের পরিকল্পনা

বাবা বা মা বিদেশে থাকলে সন্তানের পড়াশোনার খরচ, দেখভাল ও মানসিক সহায়তা কীভাবে পরিকল্পনা করবেন, কীভাবে সঞ্চয় ঠিক করবেন,...

পরিবার ও দেশে ফেরা

পরিবার দেশে রেখে প্রবাসে থাকা: সম্পর্ক ভালো রাখার উপায়

দূরে থাকলে সম্পর্কে ফাঁক তৈরি হয়। স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ, টাকার আলোচনা,...